মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসার অস্ত্রোপচার করে বাদ দেওয়া হয়েছে, তবু রোগ ফিরে আসার ভয় থেকেই যায়। সেই আশঙ্কা কমাতেই এ বার আশার আলো দেখাচ্ছে ব্যক্তিনির্দিষ্ট এমআরএনএ টিকা। প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে এই পরীক্ষাধীন টিকা প্রয়োগে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর আপেক্ষিক ঝুঁকি কমেছে ৪২ শতাংশ। তৃতীয় পর্যায়ের আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মিলেছে এই ফল। গবেষকদের আশা, রোগীর নিজস্ব টিউমারের বৈশিষ্ট্য চিনে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
তবে এখনই উচ্ছ্বাসে গা ভাসানোর সময় আসেনি। ‘ইন্টিসমেরান অটোজিন’ নামের এই টিকা এখনও পরীক্ষাধীন। নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমোদনও মেলেনি।
গবেষণায় কী দেখা গেল?
উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমায় আক্রান্ত ১,১৩৭ জন রোগীকে নিয়ে করা এই গবেষণায় সকলেরই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দৃশ্যমান টিউমার সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একদল রোগী পেয়েছিলেন শুধু পেমব্রোলিজুম্যাব, অন্য দল পেয়েছিলেন তার সঙ্গে ইন্টিসমেরান টিকা।
মেলানোমা ইনস্টিটিউট অস্ট্রেলিয়ার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দু’বছর পরে যৌথ চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের ৮২.২ শতাংশের ক্যানসার ফিরে আসেনি। শুধু পেমব্রোলিজুম্যাব পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ, দুই দলের মধ্যে ব্যবধান ১২.২ শতাংশ পয়েন্ট।
পাশাপাশি, শরীরের দূরবর্তী অংশে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া অথবা মৃত্যুর আপেক্ষিক ঝুঁকিও কমেছে ৩৮ শতাংশ। গবেষণার ফল ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিক্যাল অনকোলজির ২০২৬ সালের সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের অধ্যাপক ও মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. বনিতা নোরোনহার মতে, ব্যক্তিনির্দিষ্ট ক্যানসার টিকা নিয়ে বহু দিন ধরেই আলোচনা চলছিল। এ বার তৃতীয় পর্যায়ের গবেষণায় প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে এই পদ্ধতি যুক্ত করার উপকারের প্রমাণ মিলেছে।
টিকা চিনবে ক্যানসারকে কী ভাবে?
সাধারণ প্রতিষেধক টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। কিন্তু ইন্টিসমেরানের লক্ষ্য আলাদা—যাঁর ইতিমধ্যেই ক্যানসার হয়েছে, তাঁর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষ চিনতে শেখানো।
ক্যানসার কোষে জমতে থাকা জিনগত পরিবর্তনের ফলে তৈরি হতে পারে কিছু অস্বাভাবিক প্রোটিন, যেগুলিকে বলা হয় ‘নিওঅ্যান্টিজেন’। রোগীর টিউমারের নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু লক্ষ্য চিহ্নিত করেন। তার পর সেই লক্ষ্যগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দেশ বহনকারী এমআরএনএ দিয়ে তৈরি হয় ব্যক্তিনির্দিষ্ট টিকা।
টিকা শরীরের কোষকে সাময়িক ভাবে ওই লক্ষ্য প্রোটিন তৈরি করার নির্দেশ দেয়। এর ফলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার টি-কোষগুলি সংশ্লিষ্ট অ্যান্টিজেন চিনতে শেখে এবং ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে পারে।
অস্ত্রোপচারের পরেও শরীরে অতি ক্ষুদ্র ক্যানসার কোষ থেকে যেতে পারে, যা সাধারণ পরীক্ষায় ধরা না-ও পড়তে পারে। সেগুলিকে শনাক্ত করে ধ্বংস করতেই এই চিকিৎসার পরিকল্পনা।
এ ক্ষেত্রে পেমব্রোলিজুম্যাবের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এই ওষুধ পিডি-১ নামের একটি ইমিউন চেকপয়েন্টকে বাধা দেয়, যা টি-কোষের সক্রিয়তা সীমিত করতে পারে। সেই বাধা সরিয়ে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করে ওষুধটি।
ডা. নোরোনহার ব্যাখ্যা, টিকা রোগপ্রতিরোধী আক্রমণকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে চালিত করতে সাহায্য করে, আর পেমব্রোলিজুম্যাব সেই প্রতিক্রিয়া বজায় রাখতে সহায়তা করে।
কারা পেতে পারেন এই চিকিৎসা?
গবেষণার ফল মূলত উচ্চ ঝুঁকির স্টেজ IIB থেকে স্টেজ IV মেলানোমায় আক্রান্ত সেই রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাঁদের টিউমার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মূল চিকিৎসার পরে রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাকে বলা হয় ‘অ্যাডজুভ্যান্ট’ চিকিৎসা।
তবে শরীরে সক্রিয় ক্যানসার রয়েছে, টিউমার অস্ত্রোপচারে সরানো সম্ভব হয়নি কিংবা ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার এখনও পরীক্ষায় ধরা পড়ছে—এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এই গবেষণার ফল সরাসরি প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
এটিও মনে রাখা জরুরি, ইন্টিসমেরান পেমব্রোলিজুম্যাবের বিকল্প নয়। গবেষণায় উপকার মিলেছে দু’টি চিকিৎসা একসঙ্গে প্রয়োগে। শুধু টিকা দিয়েই একই ফল পাওয়া যাবে, এমন প্রমাণ এখনও নেই।
অন্য ক্যানসারেও কি মিলবে সাফল্য?
ফুসফুস, কিডনি, মূত্রাশয় ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার-সহ আরও কয়েক ধরনের ক্যানসারে ব্যক্তিনির্দিষ্ট এমআরএনএ টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে মেলানোমায় সাফল্য পাওয়া মানেই অন্য ক্যানসারেও একই ফল মিলবে, এমন নয়।
মেলানোমার কিছু ক্ষেত্রে জিনগত পরিবর্তনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা চিনতে পারে, এমন নিওঅ্যান্টিজেন পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকতে পারে। অন্য ক্যানসারে উপযুক্ত লক্ষ্য কম থাকতে পারে, আবার কিছু টিউমার এমন জৈবিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে, যা রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়াকে দমন করে।
ডা. নোরোনহার মতে, ফুসফুস, স্তন কিংবা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে প্রতিটি ক্যানসারের জন্য পৃথক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল প্রয়োজন।
তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই টিকার সঙ্গে ক্যানসার প্রতিরোধকারী টিকার পার্থক্য রয়েছে। এইচপিভি টিকা ভাইরাস-সম্পর্কিত বহু জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। হেপাটাইটিস বি-র টিকাও দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত যকৃতের ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। অন্য দিকে, ইন্টিসমেরান তৈরি করা হয় ইতিমধ্যেই ক্যানসারে আক্রান্ত নির্দিষ্ট রোগীর জন্য, যাতে চিকিৎসার পর রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমানো যায়।
সাফল্যের পাশাপাশি উদ্বেগও
গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমার এই সুবিধা কত দিন বজায় থাকবে? শেষ পর্যন্ত কি রোগীদের আয়ুও বাড়বে? এই মুহূর্তে সামগ্রিক ভাবে বেঁচে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো পরিণত তথ্য নেই। তার জন্য আরও দীর্ঘ সময় রোগীদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও উপেক্ষা করার নয়। গবেষণায় যৌথ চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের ৯৫.৮ শতাংশের ক্ষেত্রে চিকিৎসাজনিত কোনও না কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। শুধু পেমব্রোলিজুম্যাব পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৯০ শতাংশ।
গ্রেড ৩–৫-এর গুরুতর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার হার ছিল যৌথ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ১৪.২ শতাংশ এবং শুধু পেমব্রোলিজুম্যাবের ক্ষেত্রে ১৩.৪ শতাংশ। যৌথ চিকিৎসায় জ্বর দেখা গিয়েছে ৫২.২ শতাংশ রোগীর, ইনজেকশন দেওয়ার জায়গায় ব্যথা ৫১ শতাংশের এবং ক্লান্তি ৩৮.৫ শতাংশের। পেমব্রোলিজুম্যাবের কারণে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা টিকা তৈরি করা সহজ নয়। প্রয়োজন টিউমারের নমুনা সংগ্রহ, জিনগত বিন্যাস বিশ্লেষণ, বিশেষায়িত উৎপাদন পরিকাঠামো এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিকা তৈরি ও সরবরাহের ব্যবস্থা।
ভারতে কবে মিলবে এই চিকিৎসা?
ভারতে এই পদ্ধতি বৃহত্তর পরিসরে চালু করতে হলে খরচ, জিনগত পরীক্ষার সুযোগ, উৎপাদন পরিকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন—সব কিছুরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। আপাতত ইন্টিসমেরান নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়।
ডা. নোরোনহার সতর্কবার্তা, এই চিকিৎসাকে সম্পূর্ণ রোগমুক্তির উপায় বলা যাবে না। প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি দূর হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। বরং নির্দিষ্ট একটি রোগীগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করে উল্লেখযোগ্য উপকার দেখিয়েছে এই পদ্ধতি।
ব্যক্তির টিউমারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা তৈরি করার ধারণাটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের আয়ু বাড়ানো, অন্য ক্যানসারেও কার্যকারিতা প্রমাণ করা এবং চিকিৎসাটিকে আরও সহজলভ্য করে তোলার প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও বাকি।